independenceday-2016

Press Information Bureau

Government of India

President's Secretariat

ভারতের৭১তম স্বাধীনতা দিবস, ২০১৭-র প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রপতির ভাষণ

Posted On :14, August 2017 19:44 IST

জাতি গঠনেরকাজে নিয়োজিত প্রিয় সহ-নাগরিকবৃন্দ,

আমাদের স্বাধীনতার ৭ ০ বছরপূর্তি উপলক্ষে আপনাদের জানাই আমার অভিনন্দন।

আগামীকাল আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৭ ০ তম বর্ষপূর্তি উদযাপিত হবে। এই স্বাধীনতা বার্ষিকীর পূর্ব সন্ধ্যায় আপনাদের সকলের উদ্দেশে জানাই আমার শুভ কামনা।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টআমরা স্বাধীন জাতি হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। আমাদের নিজেদের ভাগ্য গড়ে তোলারলক্ষ্যে যাবতীয় দায়িত্ব ও সার্বভৌমত্ব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে ন্যস্ত হয় আমাদের ওপর। কেউ কেউ এই প্রক্রিয়াকে ‘ক্ষমতার হস্তান্তর’ বলে ও বর্ণনা করে থাকেন।

কিন্তু আমার কাছে এইঘটনা আরও বেশি তাৎপর্যময়। তা ছিল, দেশের এক বিশেষ স্বপ্নপূরণ – যে স্বপ্নকে লালন করে এসেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষ এবং স্বাধীনতাসংগ্রামীরা। আমাদের দেশকে কল্পনায় সাজিয়ে তুলে নতুন করে গড়ে তোলার জন্যই আমরাস্বাধীনতা লাভ করেছিলাম।

এই প্রসঙ্গে একটি বিষ য়ের উপলব্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা হল, এক স্বাধীন ভারত গঠনের মূল প্রোথিত ছিল দেশের সাধারণগ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের কল্যাণ এবং সেই সঙ্গে দেশের সার্বিক বিকাশপ্রচেষ্টার মধ্যে।

এজন্য আমরা ঋণী দেশেরঅসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে, যাঁদের মহান উৎসর্গই আমাদের জন্য এই ভিত গঠনকরে দিয়েছে।

চেন্নাম্মা, কিত্তুরেররানী, ঝাঁসির লক্ষ্মী বাঈ, মাতঙ্গিনী হাজরা – এঁরা সকলেই ছিলেন ভারত ছাড়োআন্দোলনের শহীদ ও বীর সেনানী। তাঁদের মতো ই এরকম অসংখ্য দৃষ্টান্তই রয়েছে এদেশে।

মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন সত্তরোর্দ্ধএক বৃদ্ধা নারী। এক শান্তিপূর্ণ মিছিলের নেত্রীত্বদানকালে বাংলার তমলুকে উপনিবেশবাদীপুলিশ তাঁকে গুলিবিদ্ধ করে। ‘বন্দে মাতরম্‌’ ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে তিনিমৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর হৃদয়ের অন্তস্থলে জাগরূক ছিল এক স্বাধীন ভারতেরউচ্চাশা।

সর্দার ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকুল্লা খান, বীরসামুন্ডা এবং তাঁদের মতোই আরওহাজার হাজার স্বাধীনতার যোদ্ধা জাতির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে গেছেন। আমরা কখনোইতাঁদের বিস্মৃত হতে পারি না।

আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের আদিকাল থেকেই বহু বিপ্লবী নেতাকে লাভ করার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিল, যাঁরাদেশের পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে গেছেন।

তাঁরা শুধুমাত্ররাজনৈতিক স্বাধীনতার কথাই উচ্চারণ করতেন না। মহাত্মা গান্ধী বিশেষভাবে জোর দিতেনভারত তথা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার নৈতিক চরিত্র গঠনের ওপর। গান্ধীজির সেই সমস্ত নীতিআজও সমান প্রাসঙ্গিক।

দেশব্যাপী সংস্কার ওস্বাধীনতার আন্দোলনে গান্ধীজি কখনোই একা ছিলেন না। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসদেশবাসীকে উদ্দীপ্ত করেছিলেন এই কথা বলে যে, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদেরস্বাধীনতা দেব’। তাঁর এই কথায় লক্ষ লক্ষ ভারতবাসী তাঁদের সর্বস্ব ত্যাগ করেস্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাঁরই নেতৃত্বে।

ভারতের যুগ যুগ ধরে চলেআসা ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার আমাদের কাছে খুবই প্রিয় । কিন্তু এক আধুনিক প্রযুক্তি ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তারসহ-অস্তিত্বকেও যে আমরা অস্বীকার করতে পারি না, একথা বলেছিলেন নেহরুজি।

জাতীয় ঐক্য ও সংহতিরগুরুত্ব আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করে গেছেন সর্দার প্যাটেল। একইসঙ্গে, সুশৃঙ্খল একজাতীয় চরিত্র গঠনের ওপরও বিশেষ জোর দিতেন তিনি।

সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য, আইনের শাসন এবং শিক্ষার আশু প্রয়োজন সম্পর্কে দেশবাসীকেউদ্বুদ্ধ করেছিলেন বাবাসাহেব ভীম রাও আম্বেদকর।

এই বিশিষ্ট ও মহাননেতাদের কয়েকজনের দৃষ্টান্ত আমি তুলে ধরলাম মাত্র। এ ধরণের বহু উদাহরণ ই আমিআপনাদের সামনে তুলে ধরতে পারি। যে প্রজন্ম আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, তা ছিলবড়ই বৈচিত্র্য পূর্ণ । দেশের বিভিন্ন প্রান্তেরপ্রতিনিধিত্বকারী নার ী-পুরুষছিলেন এই প্রজন্মের মধ্যে এবং তাঁদের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনারএক বিচিত্র সমাহার।

এই ধরণের বীর ও সাহসীস্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছ থেকেই আমাদের অনুপ্রাণিত হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মধ্যেঅনেকেই শুধুমাত্র দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। জাতি গঠনের কাজে আজ ঐ শক্তি ওমানসিকতা লাভের জন্য আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে।

নীতিগত কর্মপ্রচেষ্টার নৈতিক ভিত, ঐক্য ওশৃঙ্খলার ওপর আস্থা, ঐতিহ্য ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ের ওপর বিশ্বাস এবং আইন ও শিক্ষারশাসনের প্রসারের ওপর গুরুত্ব সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে অংশীদারিত্বের এক বন্ধন গড়েতুলতে পারে।

আর এইভাবেই সরকার ও নাগরিক, ব্যক্তি ও সমাজ এবংপরিবার ও এক বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের দেশ ।

সহ-নাগরিকবৃন্দ

শৈশবকাল থেকেই একটি ঐতিহ্য আমি কখনই বিস্মৃতহইনা, তা হল, কোন পরিবারে বিবাহের অনুষ্ঠান থাকলে সমস্ত গ্রামবাসী তা সুষ্ঠুভাবেসম্পন্ন করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতেন এবং সাধ্যমতো তাতে অবদানেরও নজিররাখতেন। বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে বিবাহিত কন্যা বা বধূ হয়ে উঠতেন শুধুমাত্রএকটিমাত্র পরিবারেরই কন্যা নয়, তিনি হয়ে উঠতেন গ্রামের সবক’টি পরিবারেরই কন্যারমতো।

গ্রামবাসী এবং প্রতিবেশীরা অতিথিদের আদর-আপ্যায়নকরতেন এবং বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব সামলে নিতেন। বহু পরিবার থেকেই সাধ্যমতো অবদানরাখার চেষ্টা করা হত। কোন পরিবার হয়তো বিবাহের জন্য খাদ্যশস্য দান করত, কোন পরিবারদান করত শাকসব্জি এবং তৃতীয় অপর কোন পরিবার অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে অনুষ্ঠানেউপস্থিত হত ।

তখন কোন কাজের যত্ন নেওয়া এবং তাতে মিলেমিশে কাজকরার অনুভূতি যেমন কাজ করত, সেরকমই তাঁরা সকলেই ছিলেন পরস্পর নির্ভরশীল। কেউ যদিতখন প্রতিবেশীর প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন, তিনিও তখন তাঁর নিজেরপ্রয়োজনে খুব স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের কাছ থেকে সেই সাহায্য লাভ করতেন।

কিন্তু বর্তমানে বড় বড় শহরগুলিতে আমাদেরপ্রতিবেশীরাই অনেক সময় আমাদের কাছে অপরিচিত। কিন্তু গ্রাম বা শহর যাই হোক না কেন,পরস্পরের দেখভাল করা এবং মিলিতভাবে কাজ করার সেই মানসিকতা আবার নতুন করে গড়ে তোলাখুবই জরুরি । এই ব্যবস্থায় এক ভদ্র ও সুখী সমাজ যেমন গড়ে উঠবে, সেইসঙ্গে আরও বেশিসহমর্মিতার সঙ্গে আমরা পরস্পরকে ভালো করে জানার ও বোঝার সুযোগ লাভ করব।

সহ-নাগরিকবৃন্দ

সহমর্মিতা, সমাজ সেবা এবং স্বেচ্ছায় কাজেরদায়িত্ব বহন করার এই মানসিক শক্তি কিন্তু ভারতে আজও হারিয়ে যায়নি। দেশে এখনও এমনবহু মানুষ ও সংগঠনের অস্তিত্ব রয়েছে যারা দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষদের জন্য নীরবেঅনলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে।

পথশিশুদের জন্য তাঁরা পড়াশোনার ব্যবস্থা করতেপারেন, চারপাশের বিভিন্ন পশুপাখির তাঁরা যত্ন নিতে পারেন এবং দেশের প্রত্যন্তঅঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী মানুষের কাছে তাঁরা পৌঁছে দিতে পারেন কষ্টসাধ্য জলেরযোগান। নদীকে দূষণমুক্ত করা এবং উন্মুক্ত স্থানগুলিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখারদায়িত্বও তাঁরা পালন করতে পারেন। তাঁরা হলেন জাতি গঠনের কাজে যুক্ত প্রকৃত কর্মী।আমাদের উচিৎ তাঁদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করা।

সরকারের পক্ষ থেকে নীতির সুফলগুলি যাতে সমাজেরসর্বস্তরের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয় তা নিশ্চিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে এবংস্থির লক্ষ্যে আমাদের কাজ করে যাওয়া উচিৎ। এই কাজে সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে একঅংশীদারিত্বের বন্ধন গড়ে তোলা একান্তই জরুরি :

· সরকারিভাবে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের সূচনা হয়েছে। কিন্তুএক পরিচ্ছন্ন ভারত গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সকলেরই।

· শৌচাগার নির্মাণ কিংবা শৌচাগার নির্মাণের কাজেসহায়তাদান করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব হল এই শৌচাগারব্যবহারের মাধ্যমে উন্মুক্ত স্থানে প্রাকৃতিক কাজকর্মের অভ্যাস মুক্ত এক ভারত গড়েতোলা।

· যোগাযোগ পরিকাঠামোর প্রসার ও উন্নয়নের কাজেও সরকারবর্তমান নিয়োজিত। কিন্তু আমাদের সকলের দায়িত্ব হল জ্ঞানের ঘাটতি পূরণ,সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি এবং শিক্ষা তথা তথ্যের প্রয়োজনের মতো সঠিক উদ্দেশ্যেইন্টারনেটের ব্যবহার নিশ্চিত করা।

· ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ – এই চিন্তাভাবনারপ্রসারে সরকার আগ্রহী। আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব হল আমাদের কন্যাসন্তানদের ক্ষেত্রেযাবতীয় বৈষম্যের অবসান নিশ্চিত করে তাঁদের জন্য ভালো শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

· নতুন নতুন আইন প্রণয়ন এবং কঠোরভাবে তা বলবৎ করারদায়িত্ব হল সরকারের। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকরই উচিৎ আইনের প্রতি অনুগত নাগরিক হয়েওঠা। আর এইভাবেই আইনের শাসনে বিশ্বাসী এক সমাজ গড়ে উঠতে পারে ।

· সরকারি নিয়োগ ও সংগ্রহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দুর্নীতিদূর করে স্বচ্ছতা রক্ষার ওপর সরকার বিশেষভাবে গুরুত্বদান করেছে। এক্ষেত্রে আমাদেরপ্রত্যেকরই দায়িত্ব হল প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় অন্তরের বিবেকের প্রতি সাড়া দেওয়া।

· নানা ধরনের কর আরোপের ব্যবস্থা দূর করে লেনদেনকেআরও সহজ-সরল করে তুলতে পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি)-এর রূপায়ণে সরকার সচেষ্ট।আমাদের প্রত্যেকরই দায়িত্ব হল এই বিষয়টিকে দৈনন্দিন লেনদেন তথা বাণিজ্য সংস্কৃতিরএক অভিচ্ছেদ্য অঙ্গ রূপে মেনে চলা।

পণ্য ও পরিষেবা কর ব্যবস্থায় এইরূপান্তর প্রচেষ্টা যে সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হয়েছে এজন্য আমি আনন্দিত। আমাদেরসকলেরই এই কারণে গর্ববোধ করা উচিৎ যে আমাদের দেওয়া করইবিনিয়োগ করা হয় জাতি গঠনেরকাজে – দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের সহায়তাদানের উদ্দেশ্যে, শহর ও গ্রামাঞ্চলেরপরিকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং আমাদের সীমান্ত বরাবর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরওশক্তিশালী করে তুলতে।

সহ-নাগরিকবৃন্দ

আগামী ২০২২ সালে দেশের স্বাধীনতার৭৫তম বর্ষপূর্তি উদযাপন । আমাদের জাতীয় সঙ্কল্প হল সেই সময়কালের মধ্যে এক নতুন ভারত গড়ে তোলারউদ্দেশ্যে কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণ।

নতুন ভারত – এই কথাটির অর্থকি? এর অনেকগুলি মাপকাঠি রয়েছে। যেমন, প্রত্যেকটি পরিবারের জন্য বাসস্থান, চাওয়ামাত্রই বিদ্যুতের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া, উন্নততর সড়ক ও দূরসঞ্চার ব্যবস্থা, এক আধুনিকরেল নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত ও নিরন্তর বিকাশ।

এছাড়াও, রয়েছে আরও অনেক কিছু।নতুন ভারতের চিন্তাভাবনার মধ্যে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন মানবতাবাদীদিকটিকে। এই গুণটি রয়েছে জাতির ডিএনএ-র মধ্যেই। আর এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে আমাদেরদেশ ও সংস্কৃতির প্রকৃত সংজ্ঞা তথা বৈশিষ্ট্য। নতুন ভারতকে হয়ে উঠতে হবে ভবিষ্যৎমুখীএক সমাজ ব্যবস্থা। কিন্তু একইসঙ্গে তার হয়ে ওঠা উচিৎএক সংবেদনশীল সমাজও ।

· গড়ে তুলতে হবে এমন এক সহমর্মী সমাজ ব্যবস্থাযেখানে যাঁরা যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত ও অবহেলিত- তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি কিংবাঅন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী যাই হোক না কেন - তাঁরা সকলেই যে আমাদের জাতীয় উন্নয়নপ্রক্রিয়ার এক বিশেষ অঙ্গ তা স্বীকার করে নেওয়া ।

· গড়ে তোলা প্রয়োজন এমন এক সংবেদনশীল সমাজব্যবস্থা যেখানে আমাদের বিভিন্ন রাজ্য তথা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যেযেন একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতাবোধ দানা বেঁধে না উঠতে পারে। তাঁদের সকলকেই সাদরেগ্রহণ করতে হবে আমাদেরই ভাই বা বোন হিসেবে।

· আমাদের প্রয়োজন এমন এক সহানুভূতিপ্রবণ সমাজব্যবস্থার যেখানে বঞ্চিত শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ প্রবীণ নাগরিক, দরিদ্র এবং বঞ্চিতমানুষদের কথা সবসময়ই থাকবে আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে। এঁদের কথা পরে চিন্তা করা হবে,এই মানসিকতা যেন আমাদের মধ্যে না গড়ে ওঠে। এই সমাজ ব্যবস্থায় বিশেষ যত্নবান হতেহবে আমাদের দিব্যাঙ্গ ভাই-বোনদের প্রতি যাতে জীবনের প্রতিটিক্ষেত্রেই তাঁরা সমান সুযোগের অধিকারী হতে পারেন।

· এই সমাজ ব্যবস্থাকে হয়ে উঠতে হবে সমতায় এবং সমানসুযোগের অধিকারে বিশ্বাসী এমন এক সমাজ যেখানে লিঙ্গ বা ধর্ম ভেদে বৈষম্যমূলকআচরণকে কোনভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।

· আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে হয়ে উঠতে হবে এতটাই সংবেদনশীলযাতে আমাদের মানব মূলধনকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলা যায়, কিশোর ও তরুণদের জন্য সহজসাধ্যবিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার উন্মুক্ত করে তোলা যায়। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যপরিষেবার গুণগত মানের কোন অভাব যাতে সেখানে অনুভূত না হয়।

আর এইভাবেই আমাদের স্বপ্নের সেইনতুন ভারতকে আমরা গড়ে তুলতে পারব যেখানে প্রত্যেক ভারতবাসী তাঁর নিজস্ব সম্ভাবনাকেকাজে লাগানোর সুযোগ লাভ করবেন। এই প্রচেষ্টা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে এমনভাবে যাতেসকলেই সুখী ও সন্তুষ্ট থাকেন। সমাজ তথা দেশের প্রতি অবদান সৃষ্টির সুযোগ থাকবে এইব্যবস্থার মধ্যে।

আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী যে সরকারও নাগরিকদের মধ্যে এমন এক শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠবে, যা আমাদের পৌঁছেদেবে নতুন ভারতের লক্ষ্য পূরণে।

বিমুদ্রাকরণ-পরবর্তীদিনগুলিতে যে বিশেষ ধৈর্য্য ও স্থির বুদ্ধির পরিচয় আপনারা দিয়েছেন এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণাকে যেভাবে আপনারা সর্বান্তঃকরণে সমর্থন জানিয়েছেন, তারমধ্যেই প্রতিফলন ঘটেছে দায়িত্বশীল এবং বুদ্ধি ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত আমাদের সমাজব্যবস্থার।

এক সত্যনিষ্ঠ সমাজ গড়ে তোলারকাজে আমাদের প্রচেষ্টাকে শক্তি যুগিয়েছে এই বিমুদ্রাকরণ। এই মানসিক শক্তি ও তারগুরুত্বকে আমাদের অবশ্যই ধরে রাখতে হবে।

সহ-নাগরিকবৃন্দ

প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করাএখন বিশেষভাবে জরুরি। একটিমাত্র প্রজন্মের মধ্যেই জনসাধারণের ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্যনির্মূল করার লক্ষ্য পূরণে আমাদের অবশ্যই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে । নতুন ভারত সম্পর্কে ধারণা ওচিন্তাভাবনার মধ্যে দারিদ্র্যের কোন স্থান নেই।

বর্তমানে সমগ্র বিশ্বপ্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ভারতের দিকে। এক দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক,বিকাশশীল এক অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ও বিপর্যয়, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত,মানবতার সঙ্কট, উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানসূত্রেরউদ্ভাবকহিসেবে এখন চিহ্নিত আমাদের এই দেশ।

আমাদের উত্থানকে বিশ্বেরসামনে তুলে ধরার আরেকটি সুযোগ হল ২০২০ সালে অনুষ্ঠেয় টোকিও অলিম্পিক্স। আগামী তিনবছর এই জাতীয় লক্ষ্য পূরণের জন্য আমাদের প্রস্তুত হওয়ার সময়। আমাদের প্রতিভাবানখেলোয়াড়দের চিহ্নিত করে তাঁদের কাছে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ পৌঁছে দেওয়ারকাজে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, ক্রীড়া সংগঠন এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলির উচিৎ মিলিতভাবেকাজ করে যাওয়া যাতে ঐ খেলোয়াড়রা টোকিওতে আরও বেশি করে সাফল্যের নজির সৃষ্টি করতেপারেন।

আমরা দেশে বা বিদেশে যেখানেইবসবাস করি না কেন, ভারতের সন্তান এবং নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করতেহবে যে দেশের গৌরব বাড়িয়ে তুলতে আমরা কোন কোন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারি।

সহ-নাগরিকবৃন্দ

পরিবার-পরিজনদের সম্পর্কেচিন্তাভাবনা করা আমাদের পক্ষ খুবই স্বাভাবিক । কিন্তু সেইসঙ্গে আমাদের চিন্তা করতে হবে সমাজেরভালো-মন্দের দিকটিও। শুধুমাত্র কর্তব্যের বাইরেও আমাদের যে অতিরিক্ত কিছু দেওয়াররয়েছে যেমন আরও বেশি করে নিঃস্বার্থতা – এই আহ্বানের প্রতি সাড়া দিতে হবে আমাদের।একজন মা যখন তাঁর সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করে তোলেন, তখন তিনি তাঁর কর্তব্যইশুধুমাত্র পালন করেন না, নিঃস্বার্থ সেবার এক অনন্য অবদানেরও তিনি দৃষ্টান্তস্থাপন করেন ।

· তাপদগ্ধ মরুপ্রান্তর কিংবা সুউচ্চ পর্বত শিখরেরশৈত্যপ্রবাহের মধ্যে দেশের সীমান্ত প্রহরার কাজে নিযুক্ত রয়েছেন আমাদেরসেনাবাহিনী। তাঁরা শুধুমাত্র কর্তব্যই পালন করছেন না, একইসঙ্গে তাঁরা নিঃস্বার্থসেবার এক বিশেষ মাত্রাও তাতে যোগ করে চলেছেন।

· আমাদের পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী মৃত্যুকেঅবহেলা জ্ঞান করে সন্ত্রাস ও অপরাধের হাত থেকে আমাদের মুক্ত রাখার সঙ্কল্প নিয়েকাজ করে চলেছে। তাঁরা শুধুমাত্র তাঁদের কর্তব্যই পালন করছেন না, একইসঙ্গে তাতেযুক্ত করছে নিঃস্বার্থ সেবার এক উচ্চমাত্রা।

· ভারতবাসীর মুখে অন্ন তুলে দিতে কৃষকরা কাজ করেচলেছেন খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। যাঁদের জন্য তাঁদের এই সেবাপরায়ণতা,তাঁদের সঙ্গে হয়তো কোনকালেই সাক্ষাৎকার ঘটেনি তাঁদের। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা এইকাজ করে চলেছেন শুধুমাত্র একটি দায়িত্ব বা কর্তব্য হিসেবেই নয়, একইসঙ্গেনিঃস্বার্থ সেবার এক বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে।

· প্রাকৃতিক বিপর্যয়-পরবর্তীকালে দিবারাত্র ত্রাণও উদ্ধার কাজে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেন বহু মানুষ এবং সামাজিক গোষ্ঠী ও সরকারিসংস্থাগুলি। নিঃস্বার্থ পরায়ণতার এর থেকে ভালো উদাহরণ আর কি হতে পারে।

আমরা প্রত্যেকেই কি এইনিঃস্বার্থ পরায়ণতার শক্তি নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতে পারি না?

হ্যাঁ, আমরা তা পারি এবংআমাদের মধ্যে ঐ শক্তি রয়েছেও।

প্রধানমন্ত্রীর আবেদনে সাড়াদিয়ে ১ কোটিরও বেশি পরিবার রান্নার গ্যাসের ওপর স্বেচ্ছায় ভর্তুকি ছেড়ে দিয়েছেযাতে একটি করে গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া যায় সহ-নাগরিক এক দরিদ্র পরিবারের রান্নাঘরেযাতে সেই পরিবারের সদস্যরা বিশেষত মহিলারা, উনুনের ধোঁয়া থেকে মুক্তি পেতে পারেন। কারণ,এই ধোঁয়া প্রভূত ক্ষতিসাধন করে তাঁদের দৃষ্টিশক্তি ও শ্বাসযন্ত্রের।

যে সমস্ত পরিবার স্বেচ্ছায় এইভর্তুকি ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁদের আমি সম্মান জানাই। কোন আইন বা সরকারি নির্দেশ কিন্তুতাঁদের এই কাজে বাধ্য করেনি। তাঁরা আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকেই।

আমাদের অনুপ্রাণিত হতে হবে এইপরিবারগুলির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেই। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিৎ সমাজকে কিছু ফিরিয়েদেওয়া। সহায়-সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত ভারতীয়দের সাহায্য করার পথ আমাদের নিজেদেরই খুঁজেবের করতে হবে।

জাতি গঠনের লক্ষ্যেসর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল আমাদের আগামী প্রজন্মকে সর্বতোভাবে প্রস্তুতকরে তোলা। কোন শিশুই যাতে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না থাকে তা আমাদের নিশ্চিত করতেহবে। এই কারণে আমি আপনাদের কাছে আর্জি জানাই যে জাতি গঠনের সহকর্মী হিসেবে পর্যাপ্তসামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত শিশুদের জন্য শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে। আপনারনিজের সন্তান ছাড়াও অন্য একটি শিশুকেও আপনি শিক্ষাদান করুন। তাদের জন্য বিদ্যালয়েরবেতন কিংবা বই কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন যাতে তা থেকে আপনার নিজের সন্তান ছাড়াওআরেকটি শিশুও উপকৃত হতে পারে। অন্তত একটিমাত্র অপর কোন শিশুর জন্য প্রত্যেকেই এইকাজে এগিয়ে আসুন।

এক বিশেষ সাফল্যেরদ্বারপ্রান্তে উপনীত আমাদের ভারতবর্ষ। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দেশে গড়ে উঠতেচলেছে পূর্ণ সাক্ষরএক সমাজ ব্যবস্থা। এই মানকে আমাদের আরও উন্নীত করে তোলাপ্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ পূর্ণ শিক্ষায় শিক্ষিত এক সমাজ গড়ে তোলা।

এই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্যআমরা সকলেই কিন্তু পরস্পরের অংশীদার। এই লক্ষ্য পূরণ যদি আমরা সম্ভব করে তুলতেপারি, তাহলে আমাদের দেশের রূপান্তর আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারব আমাদের দৃষ্টির সামনেই । এই বিশেষ সংজ্ঞা-নির্ধারকপরিবর্তনের দূত হয়ে উঠব আমরা সকলেই।

আড়াই হাজার বছর পূর্বে গৌতমবুদ্ধ বলেছিলেন “ অপ্পদীপোভবঃ ... অর্থাৎ, তুমি নিজেই হয়ে ওঠ এক আলোকবর্তিকা।” তাঁর এই শিক্ষাদর্শকেঅনুসরণ করে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের আবেগকে সঙ্গে নিয়ে যদি আমরা মিলিতভাবে কাজকরে যেতে পারি, তাহলে আমরা ১২৫ কোটি ভারতবাসী একত্রে প্রজ্জ্বলিত করতে পারব সেইআলোকশিখা যা আমাদের পৌঁছে দেবে এক নতুন ভারত গঠনের লক্ষ্যে।

আমি আরও একবার দেশের ৭১তমস্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে আপনাদের সকলকে জানাই আমার শুভেচ্ছা।

জয় হিন্দ

বন্দে মাতরম্‌

PG/SKD/ SB/DM